বিজ্ঞানের ইতিহাসে কিছু ঘটনা আছে, যা কেবল বিস্ময় নয়—এক ধরনের নৈতিক অস্বস্তিও তৈরি করে। আর্নল্ড সোমারফেল্ড সেই অস্বস্তির সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি ছিলেন জার্মান তাত্ত্বিক পদার্থবিদ, যিনি পরমাণু-তত্ত্ব, কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা, স্পেকট্রাল রেখার সূক্ষ্ম গঠন, এবং এক্স-রে তরঙ্গতত্ত্বে গভীর অবদান রেখেছিলেন।
কিন্তু সোমারফেল্ডের জীবনের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য অধ্যায় হলো—নোবেল পুরস্কারের সরকারি মনোনয়ন আর্কাইভ অনুযায়ী তিনি পদার্থবিজ্ঞানে ৮৪ বার মনোনীত হয়েছিলেন, ১৯১৭ থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে, অথচ কখনও নোবেল পাননি। এটি নিছক “পুরস্কার না পাওয়া” নয়; এটি বিজ্ঞান-ইতিহাসের এমন এক ব্যর্থতা, যেখানে বিচারব্যবস্থা প্রতিভাকে চিনতে পেরেও স্বীকৃতি দিতে পারেনি।
সোমারফেল্ড ছিলেন সেই বিরল বিজ্ঞানী, যিনি নিজের গবেষণার পাশাপাশি একটি সম্পূর্ণ “বৈজ্ঞানিক বিদ্যালয়” গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর মিউনিখ স্কুল শুধু ক্লাসরুম ছিল না; ছিল তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার এক কারখানা, যেখানে ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম বিজ্ঞানীরা তৈরি হচ্ছিলেন। নোবেল প্রাইজের নিজস্ব লেখাতেও বলা হয়েছে, সোমারফেল্ড নিজে নোবেল না পেলেও তাঁর “Sommerfeld school”-এর অন্তত সাতজন পরে নোবেলজয়ী হন। তাঁরা হলেন: ম্যাক্স ফন লাউয়ে, পিটার ডেবাই, ভার্নার হাইজেনবার্গ, ইসিডর আই. রাবি, উলফগ্যাং পাউলি, লাইনাস পলিং, এবং হান্স বেথে।
এই তালিকাটি দেখলেই বোঝা যায়, সোমারফেল্ড কেবল একজন বিজ্ঞানী ছিলেন না; তিনি ছিলেন নোবেলজয়ীদের শিক্ষক, মেন্টর, এবং প্রেরণার উৎস। ম্যাক্স ফন লাউয়ে এক্স-রে বিচ্ছুরণের জন্য নোবেল পান; হাইজেনবার্গ কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অন্যতম স্থপতি; পাউলি বর্জন নীতি দেন; ডেবাই অণু-গঠন ও ডাইপোল মোমেন্ট নিয়ে কাজ করেন; রাবি নিউক্লিয়ার ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্সের পথ খুলে দেন; পলিং রসায়ন ও শান্তি—দুই নোবেলের অধিকারী; বেথে নক্ষত্রের শক্তি-উৎপাদন ব্যাখ্যায় অমর। অথচ এই মহীরুহদের পেছনে যে শিক্ষক দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেই সোমারফেল্ড নিজে পুরস্কারহীন থেকে যান।
এখানেই ট্র্যাজেডি। নোবেল পুরস্কার বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ সম্মানগুলির একটি হলেও, ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে পুরস্কার সব সময় ন্যায্যতার সমার্থক নয়। সোমারফেল্ডের ক্ষেত্রে তা আরও নির্মম। তাঁর অবদান ছিল তাত্ত্বিক, সূক্ষ্ম, এবং অনেক সময় পরবর্তী বিজ্ঞানীদের কাজের ভিত্তি। তিনি বোরের পরমাণু মডেলকে উন্নত করেন, কোয়ান্টাম সংখ্যার ধারণাকে বিস্তৃত করেন, এবং পরমাণু-স্পেকট্রা বোঝার ভাষা তৈরি করেন। কিন্তু নোবেল কমিটি হয়তো তাঁর কাজের বিস্তারকে একক “আবিষ্কার” হিসেবে ধরতে পারেনি। ফলে যিনি বহু আবিষ্কারের ভিত্তি গড়লেন, তিনি নিজেই পুরস্কার পেলেন না।
এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বিজ্ঞান কেবল ল্যাবরেটরির সত্য নয়; সমাজ, প্রতিষ্ঠান, রাজনীতি, সময়, এবং মূল্যায়নের সীমাবদ্ধতাও তার অংশ। এ যেন স্বীকৃতির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক মানুষ, যিনি প্রত্যেকবার অল্পের জন্য বাইরে রয়ে গেলেন। ভারতীয় হিসাবে আমরা গর্বিত যে ইন্ডিয়ান একাডেমী অফ সায়েন্স এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এই মহান বিজ্ঞানী কে সম্মান জানাতে পেরেছিলো।
সোমারফেল্ডের জয় অন্য জায়গায়। তাঁর উত্তরাধিকার কোনও মেডেল এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর জয় তাঁর ছাত্রদের মধ্যে, তাঁর তাত্ত্বিক পদ্ধতিতে, তাঁর বইয়ে, তাঁর বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতিতে। যে শিক্ষক সাতজন নোবেলজয়ী তৈরি করেন, তিনি নিজে নোবেল না পেলেও বিজ্ঞানের ইতিহাসে তাঁর আসন অক্ষয়। তাই সোমারফেল্ডের গল্প শুধু বঞ্চনার গল্প নয়; এটি প্রমাণ করে, প্রকৃত মহত্ত্ব কখনও কখনও পুরস্কারের চেয়েও বড়। আর্নল্ড সোমারফেল্ডের মৃত্যুর তারিখ: ২৬ এপ্রিল ১৯৫১। আজকে এই দিনে এই মহান বিজ্ঞানীকে আমাদের শ্রদ্ধাপূর্ণ প্রণাম।
রেফারেন্স লিস্ট:
১. Nobel Prize Nomination Archive: Arnold Sommerfeld
https://www.nobelprize.org/
২. NobelPrize.org: The Nobel Prize in Physics 1914 – Perspectives
https://www.nobelprize.org/
৩. Encyclopaedia Britannica: Arnold Sommerfeld
https://www.britannica.com/
৪. Wikipedia: Arnold Sommerfeld
https://en.wikipedia.org/wiki/
রচনা ও সম্পাদনা: পিনাকী মন্ডল